নিজস্ব প্রতিবেদক

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তারা গা-ঢাকা দিলেও ব্যতিক্রম রাজধানীর ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। উপাচার্য পদে রদবদল হলেও এখানে দৃশ্যত কোনো প্রভাব পড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনের সব পর্যায়ে এখনো বহাল রয়েছে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দাপট। খোদ উপাচার্যের বিরুদ্ধেই আওয়ামী সমর্থক ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর নেতাদের নিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।

তথ্য নিয়ে জানা যায়, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান—যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই তিনি দুজন একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগ দেন। তারা হলেন আশফাক আখতার ও ইমরুল কায়েস। দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি। এর মধ্যে আশফাক আখতার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও দুজন উপাচার্যের পিএস ছিলেন।

শুধু পিএস পদেই নয়, উপাচার্যের কার্যালয়ের নতুন সহকারী রেজিস্ট্রার মাহবুবুর রহমান বঙ্গবন্ধু পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য। জনসংযোগ, তথ্য ও পরামর্শ দপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে থাকা আবু ছালেহ মো. মুছাও সংগঠনটির সহ-সভাপতি। সহকারী রেজিস্ট্রার জাহান উদ্দিন বঙ্গবন্ধু পরিষদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং ট্রেজারারের একান্ত সচিব আজাহারুল ইসলাম হিমেল সংস্থাটির সহ-সম্পাদক পদে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান উপাচার্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে বেছে বেছে আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন। সাবেক শিক্ষা সচিব এন আই খানের সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া ইয়াছিন আলী (সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) বর্তমানে পরীক্ষা দপ্তরের প্রশাসন শাখার প্রধান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান সাব্বিরকে দেওয়া হয়েছে পরিবহন শাখার দায়িত্ব। কমিটি শাখার দায়িত্বে আছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক সহকারী রেজিস্ট্রার শাহনেওয়াজ।

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি ফয়সাল আহম্মেদকে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে বিল শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার হাতে পরীক্ষা দপ্তরের সব আর্থিক নিয়ন্ত্রণ। নিয়োগ শাখার দায়িত্বে বসানো হয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদ হোসেনকে। কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে বিগত উপাচার্যের আমলে তাকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর থেকে বদলি করা হয়েছিল। অর্থ দপ্তরে ১০ জন সহকারী পরিচালক থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো. রুমি কিসলুকে।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, সামনে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ চক্র গড়ে উঠেছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ পরিচালক ও অধ্যাপকসহ উচ্চপদগুলোতে নিজের পছন্দের ছয়জন কর্মকর্তাকে লিয়েনে নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য। এর মধ্যে পাঁচজনই তার আগের কর্মস্থল কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকর্মী। এমনকি এই বলয়ে থাকা নেতাদের নিয়ে নিয়মিত অফিস সময়ের পর গোপন বৈঠকের গুঞ্জনও রয়েছে।

প্রশাসনের এমন ‘একচেটিয়া’ পদায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। যেকোনো সময় ক্যাম্পাসে অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা ক্ষোভের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খানের নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।